ইবরাহিম (আঃ) চলে গেলেন। তিনি অনেক দূরে চলে গেলেন, তাঁর স্ত্রী ও ছেলেকে আর দেখা যাচ্ছিল না। তখন কাবার দিকে মুখ ফিরিয়ে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে একটি দুআ করেন। এই চমৎকার দুআটি আছে কুরআনের সূরা ইবরাহিমে,
“হে আমাদের রব, আমি নিজের এক সন্তানকে তোমার পবিত্র গৃহের সন্নিকটে অনুর্বর উপত্যকায় আবাদ করেছি। হে আমাদের রব, যাতে তারা সালাত কায়েম রাখে। আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং তাদেরকে রিযিক্ব প্রদান করুন ফল-ফলাদি থেকে, যাতে তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।” (সূরা ইবরাহিম, ১৪ : ৩৭)
Maslow’s hierarchy of needs নামে একটি তত্ত্ব আছে যেখানে মানুষের বিভিন্ন চাহিদাকে একটি পিরামিড আকারে দেখানো হয়েছে। এই পিরামিডের সবচেয়ে নিচের স্তরে আছে মানুষের শা-রীর-বৃত্তীয় চাহিদা। অর্থাৎ এই তত্ত্ব অনুসারে শারী-রিক চাহিদা (যেমন খাদ্যগ্রহণ) মানব জাতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চাহিদা। গুরুত্বের দিক থেকে এর পরে আছে যথাক্রমে সামাজিক চাহিদা (সমাজবদ্ধ হয়ে থাকা), আধ্যাত্মিক চাহিদা (ধ-র্ম-চর্চা) এবং পিরামিডের চূড়ায় আছে আত্মোপলব্ধি; নিজের সম্ভাবনা ও প্রতিভাকে আবিষ্কার করে তা বিকশিত করতে ধাবিত হওয়া (self-actualization)। মাসলোর এই তত্ত্ব অনুযায়ী বলতে হয়, একজন মানুষ প্রথমে তার শা-রীর-বৃত্তীয় চাহিদা পূরণ করতে সচেষ্ট হবে, তারপর দলবদ্ধ হয়ে থাকতে শুরু করবে, এরপর ধ-র্মে-র খোঁজ করবে এবং অবশেষে সে নিজস্ব স্বকীয়তা ও সৃষ্টিশীলতার সন্ধান করতে শুরু করবে।
কিন্তু ইবরাহিম (আঃ) এর দুআতে তত্ত্বের এই পিরামিডটিকে সম্পূর্ণ উল্টো রূপে দেখা যায়। তিনি তাঁর পরিবারের জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে প্রথমেই যা চেয়েছেন তা হলো–লি ইউক্বীমুস স্বলাহ–যেন তারা সালাত কায়েম করে। অর্থাৎ তিনি প্রথমে অগ্রাধিকার দিয়েছেন আধ্যাত্মিক চাহিদা পূরণের প্রতি।
এরপর তিনি দুআ করেছেন, ফাজ’আল আফ-ইদাতাম মিনান নাস–আপনি কিছু লোকের অন্তরকে তাদের প্রতি আকৃষ্ট করুন। এখানে তিনি তাঁর পরিবারের জন্য মানুষের অন্তরে ভালোবাসা গড়ে দেওয়ার জন্য আল্লাহ তাআলার কাছে অনুরোধ করেছেন। এটি হলো তাঁর পরিবারের জন্য সামাজিক চাহিদা। সবশেষে তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে যা চাইলেন তা হলো রিযক্ব অর্থাৎ তাদের শা-রীর-বৃত্তীয় চাহিদাপূরণ–ওয়ারযুক্বুহুম মিনাস সামারাত–তাদেরকে ফলাদি দ্বারা রুজি দান করুন।
তবে এখানে এটাও লক্ষণীয়, ইবরাহিম (আঃ) তাঁর দুআর শেষ অংশে শুধুমাত্র রুজির ব্যবস্থা করে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেননি বরং এর সাথে ইবাদাতের ব্যাপারটিও যুক্ত করে দিয়েছেন, তিনি বলেছেন, লা আল্লাহুম ইয়াশকুরুন–যেন, তারা শুকরিয়া আদায় করে, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।
.
~ 'সীরাহ : মুহাম্মাদ (সা.)' — বই থেকে!
